বিবাহ ও তালাক ডিজিটাল না হওয়ায় মানুষের যত ভোগান্তি: বাস্তবতা ও করণীয়

বিবাহ ও তালাক ডিজিটাল না হওয়ায় মানুষের যত ভোগান্তি: বাস্তবতা ও করণীয়

বিবাহ ও তালাক ডিজিটাল না হওয়ায় ভোগান্তি চরমে। বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়ায় নানা খাত আধুনিক হয়েছে। ভূমি, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, এমনকি আদালতের মামলার শুনানিও এখন অনলাইনে হচ্ছে। অথচ এখনো বিবাহ ও তালাক নামের দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ও আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল নয়। ফলে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত পড়তে হচ্ছে নানাবিধ জটিলতা ও বিড়ম্বনায়।

বিয়েতে বর্তমান সীমাবদ্ধতা

বিবাহের সময় নিয়ম অনুযায়ী কাজী সাহেব বা রেজিস্ট্রার কর্তৃক কাবিননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধন করা হয়। কিন্তু এখনো অধিকাংশ জায়গায় এটি হাতে লেখা বইয়ে রেকর্ড করা হয়। এতে একাধিক সমস্যা দেখা দেয়:

  • রেকর্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন, বিশেষ করে অনেক বছর পর দরকার হলে।
  • অনেক সময় নকল হারিয়ে যায় বা পাওয়া যায় না।
  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য কোনো সরকারি তথ্যভান্ডারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈবাহিক অবস্থা যুক্ত হয় না এবং কারও বর্তমান বৈবাহিক অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না।
  • বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিয়ের রেজিস্ট্রেশন অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও জটিল হয়।
  • ভয়ভীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনৈতিক লেনদেন এর কারনে কাজী সাহেব বা রেজিস্ট্রার কর্তৃক মানুষকে প্রতারিত করার সুযোগ থাকে।

তালাক প্রক্রিয়ার জটিলতা

একই রকম জটিলতা রয়েছে তালাক সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়াতেও। একজন ব্যক্তি তালাক দিতে চাইলে বর্তমান আইন অনুসারে ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি কর্পোরেশন এর চেয়ারম্যান/মেয়র বরাবর নোটিশ দিতে হয় এবং তিন মাসের মধ্যে তা কার্যকর হয়। তবে:

  • এখনো এটি করতে হয় ডাক বিভাগের মাধ্যমে, ফলে দেরি ও ভুলভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে।
  • তালাক রেজিস্ট্রেশন অনেক সময় সঠিকভাবে হয় না, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।
  • কেউ কেউ তালাকপ্রাপ্ত হয়েও জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে তা প্রতিফলিত না হওয়ায় পরবর্তীতে আবার বিয়ে করতে গেলে বিপাকে পড়েন কিংবা নিজেকে কুমারি বা ১ম বিবাহ দাবি করে প্রতারনাপূর্বক একাধিক বিবাহ করেন বা করার সুযোগ থাকে।
  • নারী বা দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাসরতদের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া।

অনলাইন ব্যবস্থা চালুর উপকারিতা

এই প্রেক্ষাপটে, বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে:

  • জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে বিয়ে ও তালাক যাচাই করা যাবে।
  • নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে অনলাইনে কাবিননামা ও তালাকনামা ডাউনলোড করা যাবে।
  • সরকার একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে সকল নাগরিকের বৈবাহিক অবস্থা স্বচ্ছভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
  • ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিয়েতে প্রতারণা, ভুয়া তালাক বা গোপন বিবাহের মতো অপরাধ কমবে।

যেখানে সরকারি খাতের প্রায় সব জায়গায় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেখানে বিবাহ ও তালাকের মতো মৌলিক পারিবারিক আইনি প্রক্রিয়া এখনো পুরনো ধাঁচে চলছে—এটি সত্যিই বিস্ময়কর ও দুর্ভাগ্যজনক। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে এই খাতকে অন্তর্ভুক্ত না করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চলতেই থাকবে। সরকারের উচিত দ্রুত সময়ের চাহিদা অনুযায়ী একটি সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নাগরিকদের এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেওয়া।

কাজিমুল ইসলাম

অ্যাডভোকেট

জজ কোর্ট, টাঙ্গাইল

মোবাইল: 01760-848419

সাম্প্রতিক
error: Content is protected !!