চেক ডিজঅনার বা চেক ফেরত যাওয়ার মামলা—এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত ফৌজদারি মামলাগুলোর একটি। অনেক সময় প্রকৃত প্রতারণা হয়, আবার অনেক সময় মানুষ বাস্তব আর্থিক চাপ বা কারিগরি ভুলে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে। কিন্তু আইনটি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—তা হলো: আপিল করার আগে অন্তত ৫০% টাকা আদালতে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ সংশোধনীর মাধ্যমে আইনের ১৩৮(ক) ধারায় এই আইনি বাধ্যবাধকতা পরে যুক্ত করা হয়। যার ফলে চেক ডিজঅনার মামলায় সাজা পাওয়া ব্যক্তি আপিল করতে চাইলে তাকে তর্কিত চেকে উল্লেখিত টাকার অন্তত ৫০% আদালতে জমা দিতে হবে।
এই নিয়মটি কেন বিতর্কিত?
আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল—চেকের অপব্যবহার রোধ করা, যাতে মানুষ ইচ্ছেমতো চেক ইস্যু করে প্রতারণা না করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই আইনটি বিচারপ্রার্থী অনেক নিরপরাধ বা আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষকে আপিলের অধিকার থেকেই বঞ্চিত করছে।
উদাহরণ:
কোনো ব্যক্তি যদি ৫ লক্ষ টাকার চেক মামলায় নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং জরিমানা ধার্য হয়, তাহলে তাকে আপিলের সময় কমপক্ষে ২.৫ লক্ষ টাকা এককালীন আদালতে জমা দিতে হবে—তা না হলে আদালত তার আপিল গ্রহণই করবে না।
সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১ এ বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং প্রত্যেকের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু এই ৫০% টাকা জমার নিয়ম কার্যত গরিব ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষকে বিচারের অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
এটি এমন এক “অদৃশ্য দেয়াল” তৈরি করছে, যেটি পেরিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা সকলের নেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
যখন সাজা এখনও চূড়ান্ত নয় (কারণ আপিল প্রক্রিয়া চলছে), তখন আগেই বড় অঙ্কের টাকা জমা দেওয়া কতটা ন্যায্য?
এটি বিচার ব্যবস্থায় “presumption of innocence” বা “বিচার চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত দোষী না ধরা” এই নীতির বিরোধিতা করে।
সমস্যার বাস্তব প্রতিফলন:
- অনেক সীমিত আয়ের মানুষ কেবল এই কারণে সাজা মেনে নিচ্ছেন—তারা আপিল করতেই পারছেন না।
- কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপর পক্ষ সুযোগ নিচ্ছেন এই বলে—“চুপচাপ মীমাংসা করো, না হলে ৫০% টাকা জমা দিয়ে কোর্টে যাও”—এমন চাপ তৈরি করা হয়।
সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে?
১. আদালতকে বিচার বিবেচনায় ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া – যেন বিশেষ ক্ষেত্রে পুরো টাকা বা আংশিক ছাড় দেওয়া যায়।
২. পর্যায়ভিত্তিক অর্থ জমা পদ্ধতি – ২৫% শুরুতে, বাকিটা রায়ের পর।
৩. গরিব বা প্রান্তিক নাগরিকের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা – Legal Aid বোর্ডের মাধ্যমে জামানতের সহায়তা।
উপসংহার:
চেক ডিজঅনার একটি বাস্তব সমস্যা—এ বিষয়ে কঠোর আইন থাকা জরুরি। তবে, কঠোরতা যেন ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত না করে।
বিচারব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সামর্থ্য কখনোই আপিলের পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারে না—এটাই ন্যায়ের মূলনীতি।
সময় এসেছে আইনটি আবার খতিয়ে দেখার, সংশোধনের, এবং বিচারপ্রার্থীদের প্রকৃত ন্যায্যতা নিশ্চিত করার।
কাজিমুল ইসলাম
এডভোকেট
জজ কোর্ট, টাঙ্গাইল
মোবাইল : 01760848419